সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মণিকোঠায়.....

একটা মানুষের মনে কজনকে স্থান দেয়া যায়? গত কদিন হল এই চিন্তাটাই মাথায় ধপসিয়ে(অর্থাৎ, ধপাস করে) পড়েছে।

অনেকে বলেন- ছোট থাকতেই ভালো ছিলাম। হয়তোবা। আমিও অনেকসময় নিজেকে একথা বলি। ছোট থাকতে ভাবতাম- বড় হলে এই করব, সেই করব, যত জনের উপর মনে রাগ আছে, ঝাল মিটিয়ে নেব, এইসব ;) এখন, যখন কিছুটা বড় হয়েছি, তখন মনে হয়- ছোট থাকতেই ভালো ছিলাম, এত কিছু বুঝতাম না, ঝামেলাও ছিলো না, চিন্তাও ছিল না।
কিন্তু মানুষ বড় হয়ে যায়।
সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা সবসময়ই থাকে। জীবনের এক একটা ধাপে এসে সেটা বুঝতে পেরে মানুষ অবাক হয়ে যায়- জীবনটা এত মায়াময়! ভাই-বোনদের মাঝের ভালোবাসাটাও অনেকটা সেরকম। সবসময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু মাঝে মাঝে।
ছোট থাকতে এগুলোর কিছুই বুঝতাম না। বরং নানান কারণে আব্বু-আম্মু কিংবা ভাইয়া, বড়াপু, মেজাপুর উপর রাগ হয়ে থাকতাম। মনে হত- এরচেয়ে মামা/খালা কিংবা অমুকই তো ভালো, আমার সাথে এমন করে না, আদর করে। কিংবা- আমি মরে গেলে তখন কেমন লাগবে? হুঁহ, তখন আমার কথা মনে করে কান্না করা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।
একটা বাচ্চা সবার মনে স্থান করে নেয় খুব সহজে, খুব দৃঢ়ভাবে। কিন্তু কাউকে মনে স্থান দিতে শেখে না। একটু একটু করে যখন বড় হতে থাকে, তখন হঠাৎ হঠাৎই ভালোবাসার মঙ্গল প্রদীপগুলো আবিষ্কার করে বিস্মিত হয়ে যায়। তারপর নিজের অজান্তে তাকে মনে স্থান দিয়ে দেয়! তখন শত অভিযোগ-অনুযোগ, সবকিছু একহাতে ঠেলে সরিয়ে আরেকহাতে তাকে তুলে আনে, মনের মাঝে কোন একটা সুন্দর কোঠায় বসিয়ে দেয়।

টিন-এজার একটা ছেলে বা মেয়ে যখন কোন মেয়ে/ছেলেকে ভালোবেসে ফেলে, তখন কিন্তু ঐসব মঙ্গল প্রদীপকে ভুলে যায় খুব সহজে। ভাবে, ওকেই আমি সারাজীবন ভালোবাসবো, যত ভালোবাসা ওর কাছেই পাব- এই মানুষটিকে সাথে নিয়েই আমি সারাজীবন পার করে দেব নিশ্চিন্তে। তীব্র আবেগের বশে কয়েক মিনিটের চিন্তায় সারাজীবনের ছক কেটে ফেলে- এখন শুধু জীবনটা যাপন করাটা বাকী! ঐ মানুষটির একটা মূর্তি এনে তখন মনের মাঝের আরেক কোঠায় বসিয়ে দেয়- এইতো আমার মনের মণিকোঠা। এখানে আর কেউ আসবে না, সারাজীবন এমনি অটুট থাকবে।
আরেকটু বড় হবার পর ভাবে- ধুর, কী ছেলেমানুষিটাই না করেছিলাম ওকে ভালোবেসে। আসলে ঐটা কোন ভালোবাসাই ছিল না! তারপর সামনে এগোতে থাকে।

একসময় হঠাৎ খেয়াল করে- একটা ছেলে/মেয়েকে ছাড়াও আরো কাউকে ভালোবাসা যায়, সেটা হল বন্ধু। তারপর মানুষ বন্ধুকে ভালোবাসে। তার একটা মূর্তি এনে রাখে মনের মাঝে। চোখ বন্ধ করে সেই চেহারাটা কল্পনা করে সুখে ভাসে।
কী আশ্চর্য! মনের মাঝে মানুষকে স্থান দেবার মত জায়গার অভাব হয় না। হয়তো আমরা ভুলে যাই মঙ্গল প্রদীপগুলোকে। তারা কিন্তু তখনও মনের চমৎকার সব চিলেকোঠায় বসে আলো দিতে থাকে.....। সে আলোর শক্তিতেই মানুষ এগিয়ে যায়, আরো কাউকে মনের মাঝে এনে বসায়।
মানুষ প্রায়ই একটা ভুল করে- নতুন কাউকে মনে স্থান দেবার পর আগের মানুষগুলোর কথা ভুলে যায়- আর কেউ কি কখনো আমার মনের মাঝে ছিল? নবাগত মূর্তিকে ঘষে-মেজে চকচকে করে রাখে প্রতিদিন। মঙ্গল প্রদীপগুলো কিন্তু তখনও আলো দিতে থাকে। হয়তো তার গায়ে ধুলো জমে। কিন্তু কখনোই মানুষ তাদের মন থেকে সরাতে পারে না। মানুষ একবার যখন কাউকে ভালোবেসে ফেলে, তার জন্যে মনে একটা অটুট স্থান তৈরী হয়ে যায়। এ স্থানের ধ্বংস নেই। হয়তো বিস্মৃতি আছে। কিন্তু ধ্বংস নেই।

মাঝে মাঝে যখন মনে হয়, আমি কাউকে ভালোবাসি না, কেউ আমাকে ভালোবাসে না, কাউকে আমার দরকার নেই, তখন মানুষ কিছুটা অলস সময় পেয়ে যায়, তাই না?
মনের দূর্গটার আর্চওয়ে দিয়ে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকে তখন। এখান থেকে সেখানে। তারপর আবার নতুন করে আবিষ্কারের আনন্দ- না, মূর্তিগুলো চলে যায়নি। মঙ্গল প্রদীপগুলো তেমনি আছে- একতরফাভাবে আলো দিয়ে যাচ্ছে।
আবার তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এঘর-ওঘর ঘুরে ধুলো ঝাড়ে। মূর্তিগুলোকে ঘষে-মেজে চকচকে করে তোলে নতুন করে। শুধু থমকে যায় প্রদীপগুলোর কাছে এসে- তারা অবিরাম আলো দিয়ে যাচ্ছে, সে শক্তির অভাব নেই তাদের। প্রদীপগুলোর কাছে এত দায়বদ্ধতা, কিন্তু তবু তাদের আলো দেবার বিরাম নেই। তারা কিছুই চায় না- না জ্বালানী, না গায়ে জমা ধুলো পরিষ্কার করে দেয়া।
তুমি, তোমরা এত ভালো কেন?

তারপর সে নিজেও প্রদীপ হতে শেখে। শত দূর্গ আলোকিত করে একাই। চমৎকার দেখতে সে মঙ্গল প্রদীপ। নিখুঁতভাবে গড়া, শ্রেষ্ঠ কারিগরের কাজ যেন।
সাদা কাপড়ের সলতে, বিশুদ্ধ মাটির প্রদীপ আর জলপাই এর তেল।
এর চেয়ে সুন্দর কিছু আর হয় না।
তারপর প্রদীপের পথচলা.....
আজ এ পর্যন্তই থাক।

নূরে আলম।
ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১১।

মন্তব্যসমূহ

  1. tomra bhai bon shobgula bhalo likho! kintu shobai ulta palta theory dao lol. but interesting theory. :)

    উত্তরমুছুন
  2. হুম.... সেজাপুর কাছ থেকে ভালো কমেন্ট পাওয়া! বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার বলিয়া ভাবিতে হইবেক ;)
    L, ভালো লিখি, আবার উল্টাপাল্টা থিয়োরী দেই? একইসাথে ভালোমানুষ, আবার পাগল? হা হা হা.....
    ভালো লিখি, একথা বলার জন্য ধন্যবাদ।
    আমাদের ভাইবোনদের লেখার ধরণে কি মিল আছে? তোমাদের দুই বোনের কিন্তু লেখায় কোন মিল পাওয়া যায় না.....

    উত্তরমুছুন
  3. tai? apur lekha kirokom ar amar lekha kirokom? tomader lekhar milta hocche tomra shobai khub guchay lekho, ar ja lekho ta khub drastic kichu hoy! :)

    উত্তরমুছুন
  4. pani pani?? amar lekha pore amar apu bole je ami je teenager eta khub bhalo kore bujha jay. ekbar low ekbar high!

    pani pani??? :@

    উত্তরমুছুন
  5. ya, pani pani. mone hoy, panir upor diye vashte vashte lekha! :)
    i mean, tomar lekha onek smooth.... that's good. beshi jotilota valo na.
    aar, lekhay teen ager bojha gele kharap ki!

    উত্তরমুছুন
  6. :) ভাবতেসি ব্লগিং বন্ধ রাখবো কিনা কিছুদিনের জন্য। :(

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

[ব্লগে কমেন্ট পোস্ট করার পরও যদি না দেখায়, তাহলে দ্বিতীয়বার পোস্ট করার প্রয়োজন নেই। খুব সম্ভবত স্প্যাম গার্ড সেটাকে সরিয়ে নিয়েছে, আমি পাবলিশ করে দেবো।]

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগ এবং আহমেদ দিদাতের ইরান অভিজ্ঞতা

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।)
আহমেদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫) এর নাম হয়তো অনেকের অজানা থাকবে। তবে ডা. জাকির নায়েকের নাম নিশ্চয়ই অজানা নয়। ডা. জাকির নায়েকের বর্তমান কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা হলেন আহমেদ দিদাত। আহমেদ দিদাত, যিনি কিনা ডা. জাকির নায়েকের নাম দিয়েছিলেন "দিদাত প্লাস" – পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়ানো এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেকচার দেয়া ছিলো তাঁর কাজ। যাহোক, ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ইসলামী ইরানের জন্ম হয়। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ভিজিট করেন আহমেদ দিদাত, সাক্ষাৎ করেন ইমাম খোমেইনীর সাথে এবং নিজদেশে ফিরে এসে ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তাঁর অনুভূতি তুলে ধরেন। আহমেদ দিদাতের নানা বিষয়ে বক্তব্য ও চিন্তাভাবনা বাংলা ভাষায় কিছু না কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু শিয়া-সুন্নি ঐক্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর চমৎকার বক্তব্যের অনুবাদ কোথাও না পেয়ে সবার সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই অনুবাদ করে ফেললাম। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। মূল অডিও কোথাও কোথাও শুনতে বা বুঝতে অসুবিধা হয়। কোথাওবা অডিও নিঃশব…