সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যেপথে তুমি খালিপায়ে হেঁটেছ...

......................................................
১. না। বরং, যোগ্য ব্যক্তির রাজনীতিতে আসা উচিত। নেতৃত্ব হলো যোগ্যতার বিষয়, বয়সের বিষয় নয়। ইয়াং বয়সেই যদি কেউ নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন করে, তবে তার নিজেরও যেমন দায়িত্ব লিড দেয়া, তেমনি সমাজেরও দায়িত্ব তার নেতৃত্ব মেনে নেয়া।

২. "আই হেইট পলিটিক্স", আর বিপরীতে "আই লাভ পলিটিক্স" -- কোনোটাতেই কাজ নেই। পলিটিক্স ভালোবাসারও জিনিস না, ঘৃণা করারও জিনিস না। এটা বোঝার জিনিস। "আই আন্ডারস্ট্যান্ড পলিটিক্স রিয়েলি ওয়েল" -- এইটা ইয়াং জেনারেশানের বলার কথা ছিল। এবং আশা করি, অনেকে সেটা বলার মত যোগ্যতা অর্জন করবে। এবং আমার পরিচিতদের মধ্যে আমি তেমন দেখেছিও।

৩. ম্যাক্রো ভিউ ও মাইক্রো ভিউ বলে একটা ব্যাপার আছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে গেলে তখন আমরা নির্দিষ্ট দুই চারটা বিষয়ের দিকে এত মনোযোগী হয়ে যাই যে, সামগ্রিক দৃশ্য আর আমাদের চোখে থাকে না। মাইক্রো-ভিউ এ বন্দী হয়ে পড়ি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে, তার সাথে জাতীয়-আন্তর্জাতিক বহু রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয় জড়িত আছে। সেগুলি না বুঝে সেই যোগ্যতা অর্জন না করে তরুণ/বৃদ্ধ কারোরই পলিটিক্সে নামা উচিত নয়। তবে পলিটিক্স যদি হয় ব্যক্তিস্বার্থে পেটপূজার উপায়, তবে "বিশেষ কিছু যোগ্যতা" থাকলেই হলো। আর সে যোগ্যতাগুলি কী, তা-ও আপনারা জানেন।

৪. যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের উপকার করতে চান, এবং একটা সুন্দর, নিরাপদ দেশ চান, বিশ্ব চান, তাহলে নিজেকে গড়তে হবে আগে। যে ব্যক্তি নিজেকেই পারফেক্ট করতে পারেনি, আপনার কী মনে হয়, সে দুনিয়াকে ঠিক করতে পারবে? আপনার নিজের দেহ-মনের উপর আপনার কন্ট্রোল সবচে' বেশি, অথচ একটু ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠা -- এটুকুই যদি করতে না পারেন, জাতিকে ঘুম থেকে জাগাবেন? মনে মনে চোখ বুঁজে অশ্লীল চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত করতে পারেন না, আর সমাজের নিরাপত্তা আনবেন? অতএব, নিজেকে গড়তে হবে।

৫. নিজেকে গড়ার অনেকগুলো দিক আছে। পলিটিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিশেষ কিছু বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন জরুরি। তবে তার আগে পলিটিক্স/রাজনীতির সংজ্ঞা দেয়া জরুরি। পলিটিক্স/রাজনীতি বলতে বাংলাদেশে বা আমেরিকায় বা সারা দুনিয়াতে সাধারণতঃ যা চলে ও চলছে, তা বুঝাচ্ছি না। কারণ সারা দুনিয়ার রাষ্ট্রশাসকরা মানুষের কল্যাণ চায় না, মানুষের কল্যাণে কাজ করে না। পলিটিক্স বলতে মানুষের নেতৃত্ব দেয়া বুঝাচ্ছি। এমন নেতৃত্ব, যাতে সবার কল্যাণ হয়।

৬. এই যোগ্যতা দুইভাবে অর্জন করা যেতে পারে: ম্যাক্রো ভিউ ও মাইক্রো ভিউ থেকে। আপনি যদি মনে করেন বাংলাদেশের রাজনীতির সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ বুঝবেন, সেজন্যে মাঠপর্যায় থেকে রাজনীতি করে ধীরে ধীরে "পোড়-খাওয়া ঝানু" রাজনীতিবিদ হবেন, তবে এক কথা। এমনটা অনেকেই হচ্ছে ও হয়েছে। এই গল্প সবার জানা। আমি অন্য অ্যাপ্রোচটার কথা একটু চলি।

৭. সেটা হলো, মানুষকে বোঝা, মানুষকে জানা। আপনি 'মানুষ' এর নেতৃত্ব দেবেন, 'মানুষ' এর কল্যাণ করবেন, অথচ 'মানুষ' কী জিনিস, তা জানবেন না, তাহলে অবশ্যই আপনি ভুল করবেন, এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট হলেও। যেমন, কমিউনিজম একটা 'থিয়োরী' দিলো বটে, কিন্তু তারা ব্যর্থ একারণে যে, সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা প্রতিটা মানুষের জন্মগত প্রবণতা। এটাকে উপেক্ষা করে "সকল সম্পদ রাষ্ট্রের" -- এমনটা মানুষের "basic human nature" এর পরিপন্থী।
অপরদিকে পুঁজিবাদ সফল এই কারণে যে, মানুষের মাঝে ধন-সম্পদের লোভ রয়েছে, এবং "আমার শ্রম দিয়ে আমি যা উপার্জন করব, তার সবটাই আমি ভোগ করব" -- মানুষের এই প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়েছে পুঁজিবাদ। একারণে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার উত্থান ঘটেছে। এবং বিশ্বব্যাপী যে "গণতন্ত্রের" জয়জয়কার, সেটাও এই পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা টিকিয়ে রাখারই একটি কুশলী পদ্ধতিমাত্র। অতএব, মানুষকে না বোঝায় কমিউনিজম টেকেনি। কিন্তু মানুষকে কিছুটা হলেও বুঝতে পারায় পুঁজিবাদ টিকে গিয়েছে, টিকে গিয়েছে পুঁজিবাদী অর্থ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

৮. কিন্তু সেখানেই শেষ না। পুঁজিবাদ মানুষের জৈবিকতা/লোভ/ভোগবাদিতাকে ফোকাস করে টিকে গেছে। ফলস্বরূপ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মানবিকতা, আধ্যাত্মিকতা, আত্মিক পবিত্রতার চাহিদা -- ইত্যাদি উপেক্ষিত হয়েছে। বাড়ছে ডিপ্রেশান, সুইসাইড, বাড়ছে ধনসম্পদের মাঝে থেকেও দিনশেষে 'অসুখী' মানুষের সংখ্যা।

৯. মোট কথা, 'মানুষ' বুঝতে হবে। মানুষের চাহিদা কী কী? সবগুলোর চাহিদার মাঝে ব্যালেন্স কিভাবে করা সম্ভব? সেগুলোকে কিভাবে বেস্ট ওয়েতে পূরণ করা যায়? ইত্যাদি জানতে হবে। সেজন্যে প্রাসঙ্গিক সকল পড়াশুনা ও সাধনা করতে হবে। রাজনীতি, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, ধর্ম, অর্থনীতি, অধ্যাত্ম -- ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক সকল বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে হবে, পড়াশুনা করতে হবে, এবং নিজের মত করে ভাবতে পারতে হবে। তারপর --

১০. নিজেকে আগে বদলে দেখান নিজের কাছে। কাউকে বলতে হবে না। আপনি নিজেই বুঝবেন, আপনার কী করণীয়, কতটুকু করণীয়। যখন নিজে প্রশান্ত হবেন, জীবনের সার্বিক ভারসাম্য অর্জন করবেন, তখন অন্য মানুষকে হেল্প করতে যান। সমাজে অল্প করে শুরু হলেও নেতৃত্ব দেন। আর যদি সেই যোগ্যতা অর্জন ছাড়াই নেতৃত্ব দেন -- তবেতো দেখলেনই। গোটা দুনিয়াটা কিভাবে চলছে। কমিউনিস্টরা মানুষের সম্পদ কেড়ে নিতে চাইলো, পুঁজিবাদীরা সম্পদ আগলে রাখতে বললো, তারপর অঢেল সম্পদের মধ্যে থেকে আত্মহত্যা বাড়তে লাগলো, বিত্তশালীদের মাঝে হতাশা/বিষণ্ণতা বাড়তে লাগলো। দুনিয়ার জীবনে তো বারেবারে আসা হবে না। মানবজীবন এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য খুবই ক্ষুদ্র। একে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলে না। প্রথম পদক্ষেপ থেকেই আপনাকে সঠিক হতে হবে। আর জাতিকে নেতৃত্ব দেয়া? বোঝেন, সেটা কত ওজনের একটা বিষয়?
..........................................................................
আমার এক কাজিন একদিন আমাকে খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন, ফেসবুকে বড় বড় কথা লিখলে হবে না, মাঠে নামতে হবে। আমি কিছু বলিনি। বাংলাদেশের বহু লোক রাজনীতি করে, এটা আহামরি কোনো যোগ্যতা না, আপনিও পারবেন চাইলে, আমিও পারি ইচ্ছা করলেই; কিন্তু 'মানুষ' জানতে গিয়ে আমি যা দেখেছি, তা আমাকে সেপথ থেকে বিরত রেখেছে। তাই রাজনীতি বুঝেও, এবং করার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি সেপথে হাঁটিনি। আমি অন্য কোথাও হাঁটছি, পায়ের ছাপ রাখছি।

"আমি সেই পথে হেঁটে যেতে চাই, যেখানে তুমি খালিপায়ে হেঁটেছ...।"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগ এবং আহমেদ দিদাতের ইরান অভিজ্ঞতা

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।)
আহমেদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫) এর নাম হয়তো অনেকের অজানা থাকবে। তবে ডা. জাকির নায়েকের নাম নিশ্চয়ই অজানা নয়। ডা. জাকির নায়েকের বর্তমান কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা হলেন আহমেদ দিদাত। আহমেদ দিদাত, যিনি কিনা ডা. জাকির নায়েকের নাম দিয়েছিলেন "দিদাত প্লাস" – পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়ানো এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেকচার দেয়া ছিলো তাঁর কাজ। যাহোক, ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ইসলামী ইরানের জন্ম হয়। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ভিজিট করেন আহমেদ দিদাত, সাক্ষাৎ করেন ইমাম খোমেইনীর সাথে এবং নিজদেশে ফিরে এসে ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তাঁর অনুভূতি তুলে ধরেন। আহমেদ দিদাতের নানা বিষয়ে বক্তব্য ও চিন্তাভাবনা বাংলা ভাষায় কিছু না কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু শিয়া-সুন্নি ঐক্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর চমৎকার বক্তব্যের অনুবাদ কোথাও না পেয়ে সবার সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই অনুবাদ করে ফেললাম। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। মূল অডিও কোথাও কোথাও শুনতে বা বুঝতে অসুবিধা হয়। কোথাওবা অডিও নিঃশব…